Main menu

অসুখের দিন (শেষ কিস্তি)

This entry is part 8 of 8 in the series অসুখের দিন

[ব্যর্থ এক সার্জারি নিয়ে ভোগান্তির কাহিনি এটা। যার মূল পর্ব শুরু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, এখনো চলমান। এখন একটা সিনেমাটিক ক্লাইমেক্সে দাঁড়ায়া আছে। তবে সেই গল্পে দুর্ধর্ষ কোনো অ্যাখ্যান নাই, বিরাট কোনো বাঁক-বদল নাই। অনেক বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস আছে। কিন্তু এ গল্প আমার খুবই কাছের, আমার বর্তমান। আমার স্বজনদের জন্য পরীক্ষার, আমাকে ভালোবাসার। সেই গল্পটা আমার বন্ধুদের জানাতে চাই, অন্তত এক অধ্যায়ের সমাপ্তির আগে আগে। … অবশ্য পুরো গল্পটা এভাবে শেয়ার করা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। এখন পর্যন্ত সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বদলে দেওয়া।]

কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।। কিস্তি ৫ ।। কিস্তি ৬ ।। কিস্তি ৭ ।।

রমজানে বাসার কেউ নয়টার আগে ঘুম থেকে উঠে না। এমন দিনে সকাল ছয়টায় সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে। গজ-তুলা দিয়ে পেটে চেপে ধরেছি। দুলাভাই ও নিশান ফোনে ব্যস্ত। কিছুক্ষণের মধ্যে পরিচিত সব ড্রাইভারকে তারা ফোন দিয়ে ফেলল। গতকাল আমাকে বাসায় নিয়ে আসছিল কাছের একজন ড্রাইভার। উনাকে প্রথম ফোন দেয়া হয়। কিন্তু কেউ ধরছে না। হয়তো সেহেরি খেয়ে তারাও একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠবে অথবা রাতে ট্রিপ ছিল।

বাসা থেকে অটোরিকশায় গেলে মূল সড়কের দুরত্ব মিনিট দশেক। এ এলাকায় আমরা এসেছি বছর তিনেক। এর মধ্যে রাস্তার অবস্থা দিনদিন এত খারাপ হয়েছে যে, কেউই ভাবতে পারছে না অটোরিকশায় মূল সড়ক পর্যন্ত গিয়ে উবার ধরব। আমার অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক বা কতটা রক্ত হারাচ্ছি বা ঝাঁকুনিতে কী হতে পারে আমাদের ধারণা নাই। এর মধ্যে দুইবার টয়লেটের বেগ নিয়ে কমোডে বসলাম। পেটে চাপ পড়ছে। পেট চেপে ধরে ভয়ে ভয়ে বসে আছি।

ঘণ্টা দু-এক পর একটা ফোনে রেসপন্স পাওয়া গেল। বাবু নামে এক ড্রাইভার, উনি নিজে আসতে না পারলেও অনেকবার আমাদের গাড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন। আজকেও একজনকে পাঠাবেন বললেন। ওই দিকে, রক্তে গজ-তুলা ভিজে গেছে। সোহেল নিচে নেমে বড় এক ব্যান্ডেল তুলা নিয়ে এলো। গজ পাওয়া গেল না। নিপুণ দ্রুত জায়গাটা পরিষ্কার করে তুলা ও টেপ দিয়ে মুড়ে দিলো। নয়টার দিকে গাড়ি আসতে ব্যাগ গুছিয়ে আমি, সোহেল আর নিশান রওয়ানা দিলাম।

সেই রমজান অর্থাৎ, ২০২২ সালের এপ্রিলজুড়ে ঢাকা শহর তুমুল ট্রাফিক জ্যামে ভুগেছে। বিমানবন্দর থেকে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতাল তক পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো লাগল। সামনের সিটে সোহেল, পেছনে আমার পাশে নিশান ঘুমাচ্ছে। আমার চোখে ঘুম নাই, নানা চিন্তা ভর করছে। টাকা-পয়সার একটা ভাবনা ছিল। লাখ খানেকের মধ্যে হলে চালিয়ে নিতে পারব। যে অবস্থা, তাতে বাসায় আপাতত ফেরা হবে বলে মনে হচ্ছিল না। হাসপাতালে থাকতে হবে। তবে গাড়িতে উঠতে উঠতে নিশান আশ্বস্ত করে বলল, তার কার্ড থেকে হাজার চল্লিশেক টাকা আমাকে দেবে, বাকিটা আমি দিলে চলবে। টাকা তো জোগাড় হবে, কিন্তু এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, আসলে আমার হয়েছেটা কী? কখনো কি সুস্থ হতে পারবো? বারবার পেটের দিকে হাত চলে যাচ্ছিল। যতটা সম্ভব আরামের সঙ্গে বসার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ খুবই আবেগী হয়ে উঠলাম। খুব কান্না পেল। আগের দিন বাচ্চার জন্ডিসের চিকিৎসায় হাসপাতালে গিয়ে উঠেছে আমার বউ। মানে, আমরা তিনজন এখন কোনো না কোনোভাবে হাসপাতালে। মেসেজে পুরো বিষয়টা অফিসে জানালাম। গাড়ি তখন বনানী পার হচ্ছিল।
Continue reading

বই থেকে: একটি নীল বোতাম – হুমায়ূন আহমেদ

This entry is part 13 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

[হুমায়ূন আহমেদের এই ফিকশনটা ছাপানোর পারমিশন আমাদের নাই, কাকলী প্রকাশনী থিকা ছাপানো উনার “গল্প সমগ্র” বই থিকা এই গল্পটা বাছাই করা হইছে। বইয়ের স্ক্যান কপি অনলাইনে এভেইলেবল। কপিরাইট সংক্রান্ত কোন অভিযোগ আসলে পোস্ট’টা মুছে দিতে রাজি আছি আমরা।

এমনিতে হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প নিয়া আলাপ কমই, এর একটা বড় কারণ মেবি কোন বাছাই না থাকা। যে কোন রাইটারেরই সব গল্প-উপন্যাসই তার সেরা-লেখা হওয়ার কোন কারণ নাই; বা কোন ক্রাইটেরিয়ার বেসিসে আমার সেরা বইলা ধরে নিতেছি, সেইটাও একটা ঘটনা। তবে অইসব বিচারে না গিয়াও বলা যায়, এইটা হুমায়ূন আহমেদের সিগনেচার একটা গল্প।

তো, গল্পটা পড়তে পারেন আবার।]

 

বারান্দায় এশার বাবা বসেছিলেন।
হাঁটু পর্যন্ত তোলা লুঙ্গি, গায়ে নীল রঙের গেঞ্জি। এই জিনিস কোথায় পাওয়া যায় কে জানে? কী সুন্দর মানিয়েছে তাঁকে! ভদ্রলোকের গায়ের রঙ ধবধবে শাদা। আকাশি রঙের গেঞ্জিতে তাঁর গায়ের রঙ ফুটে বেরুচ্ছে। সব মিলিয়ে সুখী-সুখী একটা ছবি। নীল রঙটাই বোধহয় সুখের। কিংবা কে জানে ভদ্রলোকের চেহারাটাই বোধহয় সুখী-সুখী। কালো রঙের গেঞ্জিতেও তাঁকে হয়তো সুখী দেখাবে।

তিনি আমাকে দেখতে পাননি। আমি ইচ্ছা করেই গেটে একটু শব্দ করলাম। তিনি আমাকে দেখলেন। সুন্দর করে হাসলেন। ভরাট গলায় বললেন, ‘আরে রঞ্জু, তুমি? কী খবর? ভালো আছ?’

“জি ভালো।
‘গরম কি রকম পড়ছে বল দেখি?’
“খুব গরম।’
“আমার তো ইচ্ছা করছে চৌবাচ্চায় গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকি।’ তিনি তাঁর পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করলেন। হাসি-হাসি মুখে বললেন, ‘বসো। তোমার কাছ থেকে দেশের খবরা-খবর কিছু শুনি।’
‘আমার কাছে কোনো খবরা-খবর নেই চাচা।’
‘না থাকলে বানিয়ে বানিয়ে বলো। বর্তমানে চালু গুজব কী?’

আমি বসলাম তাঁর পাশে। এশার বাবার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। মাঝে মাঝে এ বাড়িতে এসে শুনি এশা নেই – মামার বাড়ি গেছে। রাতে ফিরবে না। তার মামার বাড়ি চাক। প্রায়ই সে সেখানে যায়। আমার খানিকটা মন খারাপ হয়। কিন্তু এশার বাবার সঙ্গে কথা বললে আমার মন খারাপ ভাবটা কেটে যায়।

এই যে এখন বসলাম উনার পাশে— এখন যদি শুনি এশা বাসায় নেই, মামার বাড়ি গিয়েছে— আমার খারাপ লাগবে না।
‘তারপর রঞ্জু নতুন কোনো গুজবের কথা তাহলে জান না?’
‘জি না।’
‘বল কী তুমি! শহর ভর্তি গুজব। আমি তো ঘরে বসে কত কি শুনি। চা খাবে?’
‘জি না।’
‘খাও এক কাপ । তোমার সঙ্গে আমিও খাব। তুমি আরাম করে বস। আমি চায়ের কথা বলে আসি।’
“আপনাকে বলতে হবে না, আমি বলে আসছি। এশা কি বাসায় নেই?’
“আছে। বাসাতেই আছে।’ বলেই তিনি চায়ের কথা বলতে উঠে গেলেন।

কী চমৎকার তাঁর এই ভদ্রতা! আমি কে? কেউ না। অতি সামান্য একজন। একটা এ্যাড ফার্মে কাজ করি। অল্প যে ক’টা টাকা পাই তার প্রতিটির হিসাব আমার আছে। আর এঁরা? আমারা ধারণা, এদের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা দারোয়ান আমার চেয়ে বেশি টাকা পায়। নিতান্ত ভাগ্যক্রমে এঁদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে এ-বাড়িতে এসেছিলাম।

প্রথম দিনেই এশার কী সহজ সুন্দর ব্যবহার! যেন সে অনেকদিন থেকেই আমাকে চেনে। সেদিন কেমন হাসিমুখে বলল, ‘আপনি তো বেশ লম্বা। আসুন একটা কাজ করে দিন। চেয়ারে দাঁড়ান, দাঁড়িয়ে খুব উঁচুতে একটা পেরেক লাগিয়ে দিন।

আমি বললাম, ‘এত উঁচুতে পেরেক দিয়ে কী করবেন?’

‘আজ বলব না। আরেকদিন এসে দেখে যাবেন।’ Continue reading

(বাংলা-ক্লাসিক) বিশ্বনবী – গোলাম মোস্তফা [শর্ট ভার্সন।] পার্ট ১

কবি গোলাম মোস্তফার (১৮৯৭ – ১৯৬৪) এই বইটা ফার্স্ট ছাপা হয় ১৯৪২ সালে। এরপরে বইটার অনেকগুলা পাবলিকেশন্স থিকা অনেকগুলা এডিশনই ছাপা হইছে। ১৯৫৬ সালে ছাপানো ভার্সন ফলো করা হইছে এইখানে।

গোলাম মোস্তফার লেখা কোন অংশ এইখানে বদলানো হয় নাই; বরং কিছু অংশ স্কিপ করা হইতেছে, যেইটা বাদ দিলে বা উহ্য রাখলেও একটা কমপ্লিট টেক্সট হিসাবে পড়তে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা না। এমনিতে পুরা বই যদি কেউ পড়তে চান, ই-বুক, পিডিএফ এবং ছাপানো-বই হিসাবে তো অনেক জায়গাতেই এভেইলেবল আছে।  

তো, শর্ট-ভার্সনটাও পড়তে পারেন।

নতুন ভারতীয় সংস্করণের ভূমিকা

‘বিশ্বনবী’র নতুন ভারতীয় সংস্করণের ভূমিকা লিখিতে বসিয়া আজ শুধু বারে বারে আল্লাতালার করুণার কথাই মনে পড়িতেছে। কোন পুস্তকের আটটি সংস্করণের ভূমিকা লিখিবার সৌভাগ্য খুব কম লেখকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে।

এই সংস্করণের আগাগোড়া এবার আমি দেখিয়া দিয়াছি, স্থানে স্থানে কিছু কিছ সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করিয়াছি। কিছ কিছু নতুন তথ্যও সংযোজিত হইয়াছে।

গতবার পুস্তকের জ্যাকেট না দেওয়ায় অনেকেই ক্ষুন্ন হইয়াছিলেন। এবার সে অভাব পূর্ণ করা হইল। মুদ্রণ-পারিপাট্যও পূর্বাপেক্ষা এবার উন্নত হইয়াছে।

বিশ্বনবীর অনেক স্থানে কোরান শরীফের আয়াত উদ্ধৃত করা হইয়াছে। মূল আরবী আয়াত না দিয়া শুধু বাংলা তর্জমা দিয়াছি। সেই সব তর্জমার কোন কোন স্থানে আল্লা সম্বন্ধে ‘আমরা’ (বহুবচন) ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন :

“এবং যে কেহ এই দুনিয়ার পুরস্কার চায়, তাহাকে আমরা তাহাই দেই এবং যে কেহই পরকালের পুরস্কার চায়, তাহাকেও আমরা তাহাই দেই। আমরা কৃতজ্ঞদিগকে পুরুস্কৃত করিব।” – (৩:১৪৫)

এখানে আল্লার পরিবর্তে ‘আমরা’ শব্দের ব্যবহার দেখিয়া অনেক পাঠকের মনেই প্রশ্ন জাগে। তাঁহারা ভাবেন : আল্লা এক, অদ্বিতীয় ও লা-শরীক; কাজেই তাঁহার সম্বন্ধে ‘আমরা’ (বহুবচন) ব্যবহার করা যাইতে পারে না। তাই অনেকের ধারণা ইহা তর্জমার ভুল। কিন্তু তর্জমায় কোন ভুল হয় নাই। তজমা ঠিকই আছে। অন্য একটি গূঢ় কারণে ‘আমি’ স্থলে ‘আমরা’ লিখিতে হইয়াছে। আরবী ভাষায় সম্মানীয় ব্যক্তিদিগের বেলায় বহুবচন ব্যবহৃত হয়। ইহাকে সম্মানার্থে বহুবচন বলে। অন্যান্য ভাষাতেও এ বাক্-রীতি প্রচলিত আছে। কোন রাজকীয় ঘোষণায় সম্রাট, সম্রাজ্ঞী বা রাষ্ট্রপতি উত্তম পুরুষের বহুবচন (আমরা) ব্যবহার করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রের (Queen’s Proclamation) উল্লেখ করা যাইতে পারে। সেখানে ‘We’ (আমরা) ব্যবহৃত হইয়াছে। বলা বাহুল্য, এই রীতি কোরান শরীফের নিজস্ব। আল্লা নিজেই এই বাচন-ভঙ্গী শিক্ষা দিয়াছেন। ‘আমি’ না বলিয়া ‘আমরা’ বলিয়াছেন। কাজেই তর্জমার ভুল হইয়াছে—পাঠক যেন সেরূপ মনে না করেন। মূলে বহুবচন আছে বলিয়াই তর্জমাতেও বহুবচন আসিয়াছে। উপরের আয়াতের ইংরাজী তর্জমাতেও ‘We’ শব্দ আছে :

“And whoever desires the reward of this world We will give him of it and whoever desires the reward of the hereafter, We will give him of it, and We will reward the grateful.” – Moulana Muhammad Ali

আল্লামা ইউসুফ আলি একই রীতি অনুসরণ করিয়াছেন। উপরোক্ত আয়াতের অনুবাদে তিনি লিখিতেছেন: “If any do desire a reward in this life, We shall give it to him….”.

বস্তুতঃ অনুবাদ ঠিক রাখিতে হইলে মূলের সহিত তাহার মিল রাখিতেই হইবে। বলা বাহুল্য, এই কারণেই বাংলা তর্জমায় আল্লার স্থানে বহুবচন ব্যবহার করা হইয়াছে। Continue reading

ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাহেবের মৃত্যু – শাহেদ আলী

[পোস্টের হেডলাইন দেইখা অনেকেই একটু কনফিউজড হইতে পারেন। এই হেডলাইনটা হইতেছে ফিকশন রাইটার শাহেদ আলী’র অটোবায়োগ্রাফি “জীবন কথা” বইয়ের একটা চেপ্টারের নাম। উনি ১৯৫৪ সালের ইলেকশনে সুনামগঞ্জের আসনে খেলাফতে রব্বানী পার্টি থিকা এমপি হিসাবে ইলেক্টেড হইছিলেন। অই ইলেকশনে রব্বানী পার্টির একমাত্র কেন্ডিডেট উনি, যিনি ইলেকশনে জিতছিলেন। মুসলিম লীগ থিকা বাইর হয়া আইসা আবুল হাশিম রব্বানী পার্টি তৈরি করছিলেন। যুক্তফ্রন্টের সাথে জোট বাইন্ধা ইলেকশন করতে চাইছিলেন, কিন্তু যুক্তফ্রন্টের অন্য শরিকরা তাদেরকে নিতে রাজি হয় নাই। তখন রব্বানী পার্টি ১০টা সিটে কেন্ডিডেট দিছিল। অই ১০ জন থিকা শাহেদ আলী ইলেকশনে জিতছিলেন। কিন্তু উনি এরপরে বেশিদিন এক্টিভ রাজনীতিতে থাকেন নাই। মাস্টারির পেশাতে ফেরত গেছিলেন।

আর যেই শাহেদ আলী’র মারা যাওয়ার কথা উনি লেখছেন, তার পরিচয় লেখাটা পড়লেই জানতে পারবেন। ]

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে তখন আতাউর রহমান খান প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা। আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা হলেও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয়ই শেরেবাংলা এ কে এম ফজলুল হকের কৃষকশ্রমিক পার্টির। স্পিকার ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও সুসাহিত্যিক আবদুল হাকিম সাহেব । প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন লোকটি। তিনি তাঁর স্বাধীনমতো পরিষদ পরিচালনা করতেন। ক্ষমতাসীন পার্টির ইচ্ছেমতো কাজ করতেন না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবদুল হাকিম সাহেবকে নিয়ে খুব অসুবিধায় পড়ল। তারা তাদের মনের মতো করে তাদের পরিষদ চালাতে পারছিল না।

ডেপুটি স্পিকার কুমিল্লার জনাব শাহেদ আলী পাটোয়ারীও কৃষক শ্রমিক পার্টির সদস্য। কৃষক শ্রমিক পার্টির আমলেই তাঁরা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। জনাব শাহেদ আলী আইনজীবী ছিলেন। তিনি একটু নরম ও সরল মেজাজের লোক ছিলেন।

আওয়ামী লীগ তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করতে চায়। স্পিকারের স্বাধীনতা তারা মানে না। তারা চায় যে স্পিকার তাদের ইচ্ছে ও হুকুমমতো কাজ করবে। কিন্তু আবদুল হাকিম কারও হুকুম শোনার লোক নন। তিনি কবি, সাহিত্যিক ও আইনজীবী। তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে চান, তাঁর কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করুক, তা তিনি চান না। নীতি ও কঠোর ন্যায়বিচারের পক্ষপাতী। কে খুশি হলো আর কে নাখোশ হলো—এই নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। আওয়ামী লীগ তাদের কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য উদ্‌গ্রীব, কিন্তু অ্যাসেম্বলির ভেতরে স্পিকার আবদুল হাকিমের অনমনীয় দৃঢ়তার জন্য তারা অসহায় বোধ করছে। এই সময় স্পিকার আবদুল হাকিমের জন্য আমেরিকা থেকে দুই মাসের জন্য দাওয়াত আসে। সেই দাওয়াত পেয়ে আবদুল হাকিম সাহেব চলে গেলেন আমেরিকায়। ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারী স্পিকারের দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। Continue reading

শুটিং এন এলিফেন্ট (১৯৩৬) – জর্জ অরওয়েল

নিচু বার্মার মোলমেন অঞ্চলে বহু মানুষই আমারে দেখতে পারতো না। আমি ছিলাম ওই শহরের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার। ফলে একপ্রকার দিশাহীন, ছোটখাটো ইউরোপবিরোধী ঘৃণা আইসা আমার উপর পড়তো। কারো মধ্যেই দাঙ্গা বাঁধানোর সাহস ছিল না, কিন্তু একজন ইউরোপীয় মহিলা যদি একা একা বাজারের মধ্য দিয়া হাঁইটা যায় তাইলে লোকে নির্ঘাত তার জামার উপরে পানের পিক মারবে। পুলিশ অফিসার হিসেবে তাদের এই এলোপাথাড়ি ঘৃণার এক রেগুলার নিশানা ছিলাম আমি। যখনই তারা চিপা পাইত, আমার উপর তাদের ক্ষোভ ঝাইড়া নিত। একবার এক ফটকা বার্মিজ বেটা ফুটবল মাঠে আমারে ল্যাং মাইরা ফালায়া দিসিল, আর রেফারি তা দেইখাও দেখে নাই। আশেপাশের জনতা তাতে হাইসা একসের হইসিল। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে। একটা সময় আমার দিকে ঘৃণার নজর নিয়া তাকায়ে থাকা এতগুলা হলুদ জুয়ান বেটাদের মুখ, আমার থিকা নিরাপদ দূরত্বে গিয়াই লোকের আমার দিকে ছুইড়া দেয়া গালিগালাজ, এগুলা আমারে কাবু কইরা ফেললো। সবচেয়ে বিচ্ছিরি ছিল জুয়ান বৌদ্ধ সন্ন্যাসিগুলা। এদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার, আর রাস্তার চিপায় দাঁড়ায়া ইউরোপিয়ানদের প্যারা দেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ ছিল না মনে হয়।

এইসব আমার জন্য নেয়া কঠিন হইয়া পড়তেসিল। কারণ ততদিনে আমি মনে মনে ঠিক কইরা ফেলসি যে ইমপেরিয়ালিজম একটা জঘন্য জিনিস এবং যত তাত্তাড়ি সম্ভব আমার এই চাকরি ছাইড়া ভাগা দরকার। তত্ত্বে এবং গোপনে আমি ছিলাম এই বার্মিজদেরই পক্ষে, এবং তাদের ব্রিটিশ জালিমদের বিপক্ষে। এবং আমার এই চাকরির কথা যদি বলি, ওইটারে আমি এত ঘিন্না করতাম যে বইলা বুঝাইতে পারবো না। এরকম চাকরিতে সরকারের আসল নোংরামিগুলা সবচাইতে কাছ থিকা দেখা যায়। জেলখানার ছোট্ট ময়লা খাঁচাগুলায় জড়োসড়ো হইয়া পচতে থাকা কয়েদি, তাদের ফ্যাকাশে, ডরানো মুখ, বাঁশ দিয়া পিটানো কয়েদিদের দাগপড়া পাছা—এইসব কিছু আমার মধ্যে এমন এক অপরাধবোধের জন্ম দিসিল যা আর আমি নিতে পারতেসিলাম না। কিন্তু কোনোকিছুই আমি ঠিক করতে পারতেসিলাম না। তখন আমার বয়স কম ছিল এবং পড়াশুনাও তেমন ছিল না। তারউপর সবকিছু আমারে ভাবতে হইত এক ভয়াবহ নিরবতার মধ্যে যা এই অঞ্চলের প্রত্যেকটা ব্রিটিশের উপর চাপায়া দেয়া হইত। আমি এমনকি জানতামও না যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মারা যাইতেসে, এই সাম্রাজ্যের বদলে যারা আসবে তাদের কথা তো আরো না। আমি শুধু জানতাম আমি আমার সরকারের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ ক্ষোভ আর এইখানের ছোট্ট বদমাইশগুলা যারা আমার চাকরি আরো কঠিন বানায়া তুলতেসে তাদের প্রতি ঘেন্নার মধ্যে ফাঁইসা গেসি। আমার মনের এক অংশ ভাবতো ব্রিটিশ রাজের এই জুলুম কখনোই শেষ হবে না, যুগের পর যুগ ধইরা মানুষরে দমায়া রাখা হবে। আর আরেক অংশে মনে হইত দুনিয়ার সবচাইতে আনন্দের ব্যাপার হবে যদি ওই বৌদ্ধ সন্ন্যাসিটার ভুড়ির মধ্যে একটা বেয়োনেট ঢুকায়া দিতে পারি। ইমপেরিয়ালিজম এরকম উদ্ভট চিন্তার জন্ম দেয়। যেকোনো এংলো-ইন্ডিয়ান অফিশিয়ালরে জিগায়া দেখতে পারেন, যদি তারে অফ ডিউটি পান।

এরমধ্যে একদিন এমন এক ঘটনা ঘটলো যা অদ্ভূতরকমের স্পষ্টতা আইনা দিসিল। ঘটনাটা খুবই ছোট, কিন্তু এর ফলে ইমপেরিয়ালিজম নিয়া, এই কলোনিয়াল সরকারের সত্যিকারের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আমার ধারণা আগের চাইতে আরো ক্লিয়ার হইসিল। এক ভোরে আরেক অঞ্চলের এক সাব-ইন্সপেক্টর আমারে ফোন দিয়া জানাইল ওইখানে একটা হাতি বাজারে ঢুইকা সব তছনছ কইরা ফেলতেসিল, তো আমি যেন আইসা একটু দেখি ঘটনা কী। এমন সময়ে কী করা উচিত তা আমিও জানতাম না, কিন্তু এই ঘটনা সামনাসামনি দেখা দরকার মনে কইরা একটা ঘোড়ার পিঠে চইড়া আমি রওনা দিলাম। সাথে আমার রাইফেলটাও নিলাম, একটা পুরান .৪৪ উইনচেস্টার যা দিয়া হাতি মারা মোটেও সম্ভব না। কিন্তু ভাবলাম প্রয়োজন পড়লে গুলির শব্দে হাতিটারে ভয় দেখাইতে পারব। পথে বার্মিজ লোকেরা একটু পরপর আমারে থামায়া বলতে লাগলো হাতিটার কারবার সম্পর্কে। হাতিটা জংলি ছিল না, বরং একটা পোষা হাতিই ছুইটা পাগল হইয়া গেসিল। এরে চেইন দিয়া আটকায়া রাখা হইসিল কিন্তু গতরাতে সে ছুইটা যায়। হাতিটার মাহুত ছিল একমাত্র লোক যে এই দশায় তারে শান্ত করতে পারতো, কিন্তু বেটা তখনও ছিল বারো ঘণ্টা দূরের পথে। আর হাতিটা সকালবেলা শহরের মধ্যে ঢুইকা পড়লো। সাধারণ বার্মিজ জনগণের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, ফলে তারা এই বিশাল জন্তুর সামনে বেশ অসহায় হয়া পড়সিল। ততক্ষণে হাতিটা একজনের বাঁশের ঘর ভাইঙ্গা ফেলসিল, একটা গরু মাইরা ফেলসিল এবং কতগুলা ফলের দোকানে ঢুইকা সব সাবাড় কইরা ফেলসিল। এছাড়াও পথে তার একটা ময়লার ভ্যানের সাথে মোলাকাত হয়, এবং যখন ভ্যানওয়ালা নাইমা দৌড় লাগায় তখন সে ভ্যানটা উপুড় কইরা তার উপর ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। Continue reading

এডিটর, বাছবিচার।
View Posts →
কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
View Posts →
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
View Posts →
মাহীন হক: কলেজপড়ুয়া, মিরপুরনিবাসী, অনুবাদক, লেখক। ভালোলাগে: মিউজিক, হিউমর, আর অক্ষর।
View Posts →
গল্পকার। অনুবাদক।আপাতত অর্থনীতির ছাত্র। ঢাবিতে। টিউশনি কইরা খাই।
View Posts →
কবি। লেখক। কম্পিউটার সায়েন্সের স্টুডেন্ট। রাজনীতি এবং বিবিধ বিষয়ে আগ্রহী।
View Posts →
দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/
View Posts →
জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
View Posts →
পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সংসার সামলাই।
View Posts →
জীবিকার জন্য একটা চাকরি করি। তবে পড়তে ও লেখতে ভালবাসি। স্পেশালি পাঠক আমি। যা লেখার ফেসবুকেই লেখি। গদ্যই প্রিয়। কিন্তু কোন এক ফাঁকে গত বছর একটা কবিতার বই বের হইছে।
View Posts →
জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
View Posts →
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
View Posts →
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।
View Posts →
মাইক্রোবায়োলজিস্ট; জন্ম ১৯৮৯ সালে, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। লেখেন কবিতা ও গল্প। থাকছেন চট্টগ্রামে।
View Posts →
জন্ম: টাঙ্গাইল, পড়াশোনা করেন, টিউশনি করেন, থাকেন চিটাগাংয়ে।
View Posts →