অসুখের দিন (শেষ কিস্তি)
[ব্যর্থ এক সার্জারি নিয়ে ভোগান্তির কাহিনি এটা। যার মূল পর্ব শুরু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, এখনো চলমান। এখন একটা সিনেমাটিক ক্লাইমেক্সে দাঁড়ায়া আছে। তবে সেই গল্পে দুর্ধর্ষ কোনো অ্যাখ্যান নাই, বিরাট কোনো বাঁক-বদল নাই। অনেক বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস আছে। কিন্তু এ গল্প আমার খুবই কাছের, আমার বর্তমান। আমার স্বজনদের জন্য পরীক্ষার, আমাকে ভালোবাসার। সেই গল্পটা আমার বন্ধুদের জানাতে চাই, অন্তত এক অধ্যায়ের সমাপ্তির আগে আগে। … অবশ্য পুরো গল্পটা এভাবে শেয়ার করা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। এখন পর্যন্ত সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বদলে দেওয়া।]
…
কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।। কিস্তি ৫ ।। কিস্তি ৬ ।। কিস্তি ৭ ।।
…
রমজানে বাসার কেউ নয়টার আগে ঘুম থেকে উঠে না। এমন দিনে সকাল ছয়টায় সবাই আমাকে ঘিরে বসে আছে। গজ-তুলা দিয়ে পেটে চেপে ধরেছি। দুলাভাই ও নিশান ফোনে ব্যস্ত। কিছুক্ষণের মধ্যে পরিচিত সব ড্রাইভারকে তারা ফোন দিয়ে ফেলল। গতকাল আমাকে বাসায় নিয়ে আসছিল কাছের একজন ড্রাইভার। উনাকে প্রথম ফোন দেয়া হয়। কিন্তু কেউ ধরছে না। হয়তো সেহেরি খেয়ে তারাও একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠবে অথবা রাতে ট্রিপ ছিল।
বাসা থেকে অটোরিকশায় গেলে মূল সড়কের দুরত্ব মিনিট দশেক। এ এলাকায় আমরা এসেছি বছর তিনেক। এর মধ্যে রাস্তার অবস্থা দিনদিন এত খারাপ হয়েছে যে, কেউই ভাবতে পারছে না অটোরিকশায় মূল সড়ক পর্যন্ত গিয়ে উবার ধরব। আমার অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক বা কতটা রক্ত হারাচ্ছি বা ঝাঁকুনিতে কী হতে পারে আমাদের ধারণা নাই। এর মধ্যে দুইবার টয়লেটের বেগ নিয়ে কমোডে বসলাম। পেটে চাপ পড়ছে। পেট চেপে ধরে ভয়ে ভয়ে বসে আছি।
ঘণ্টা দু-এক পর একটা ফোনে রেসপন্স পাওয়া গেল। বাবু নামে এক ড্রাইভার, উনি নিজে আসতে না পারলেও অনেকবার আমাদের গাড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন। আজকেও একজনকে পাঠাবেন বললেন। ওই দিকে, রক্তে গজ-তুলা ভিজে গেছে। সোহেল নিচে নেমে বড় এক ব্যান্ডেল তুলা নিয়ে এলো। গজ পাওয়া গেল না। নিপুণ দ্রুত জায়গাটা পরিষ্কার করে তুলা ও টেপ দিয়ে মুড়ে দিলো। নয়টার দিকে গাড়ি আসতে ব্যাগ গুছিয়ে আমি, সোহেল আর নিশান রওয়ানা দিলাম।
সেই রমজান অর্থাৎ, ২০২২ সালের এপ্রিলজুড়ে ঢাকা শহর তুমুল ট্রাফিক জ্যামে ভুগেছে। বিমানবন্দর থেকে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতাল তক পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো লাগল। সামনের সিটে সোহেল, পেছনে আমার পাশে নিশান ঘুমাচ্ছে। আমার চোখে ঘুম নাই, নানা চিন্তা ভর করছে। টাকা-পয়সার একটা ভাবনা ছিল। লাখ খানেকের মধ্যে হলে চালিয়ে নিতে পারব। যে অবস্থা, তাতে বাসায় আপাতত ফেরা হবে বলে মনে হচ্ছিল না। হাসপাতালে থাকতে হবে। তবে গাড়িতে উঠতে উঠতে নিশান আশ্বস্ত করে বলল, তার কার্ড থেকে হাজার চল্লিশেক টাকা আমাকে দেবে, বাকিটা আমি দিলে চলবে। টাকা তো জোগাড় হবে, কিন্তু এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, আসলে আমার হয়েছেটা কী? কখনো কি সুস্থ হতে পারবো? বারবার পেটের দিকে হাত চলে যাচ্ছিল। যতটা সম্ভব আরামের সঙ্গে বসার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ খুবই আবেগী হয়ে উঠলাম। খুব কান্না পেল। আগের দিন বাচ্চার জন্ডিসের চিকিৎসায় হাসপাতালে গিয়ে উঠেছে আমার বউ। মানে, আমরা তিনজন এখন কোনো না কোনোভাবে হাসপাতালে। মেসেজে পুরো বিষয়টা অফিসে জানালাম। গাড়ি তখন বনানী পার হচ্ছিল।
Continue reading