আপনি আসলে কে সেইটা ঠিক বুইঝা উঠতে পারার আগে আপনি লিখতে পারবেন না – সালমান রুশদি
সালমান রুশদির জন্ম বোম্বেতে ১৯৪৭ সালে, ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিনে। পড়ালেখা ওইখানে আর ইংল্যান্ড মিলায়ে, পরে ইংল্যান্ডেই লেখালেখির জীবনের বেশিরভাগ অংশ কাটান। ইদানীং রুশদি মূলত তার নিউইয়র্কের বাড়িতেই থাকেন, সেইখানেই এই ইন্টারভিউটা গত এক বছর ধইরা কয়েক দফায় নেয়া হয়। কাকতালীয়ভাবে, দ্বিতীয় দফার ইন্টারভিউটা নেয়া হইসিলো ২০০৫ সালের ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে, যা কিনা একইসাথে রুশদীর বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ফতোয়ার ষোলতম বছরপূর্তির দিন। সেই ফতোয়ায় রুশদীরে সেটানিক ভার্সেস লেখার জন্য কাফের দাবি করা হয় এবং ইসলামী আইন মোতাবেক তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। ১৯৯৮ সালে, মোহাম্মেদ খাতামি, ইরানের প্রেসিডেন্ট এই ফতোয়া নাকচ করে, এবং রুশদীও ধারণা করেন বিপদ কাইটা গেসে। কিন্তু কট্টরপন্থী মুমিনেরা মনে করেন ফতোয়া নাকচ করা যায় না এবং রুশদীর ঠিকানা এখনও গোপন রাখা আছে।
যেই লোকরে ঘিরা এত ভয়ানক কাণ্ড ঘইটা গেলো, যারে এইভাবে প্রকাশ্যে ঘৃণা ও অপবাদ দেয়া হইসে, হুমকি ও তলব করা হইসে, যার কুশপুত্তলিকা পুড়ানো হইসে, আবার যারে তুইলা ধরা হয় বাকস্বাধীনতার এক অনন্য আইডল হিসেবে, এরকম একটা মানুষের হিসাবে রুশদী খুবই সাবলীল আর ক্যান্ডিড—তিনি খুব কর্কশও না আবার ভিক্টিম মেন্টালিটিরও না। ক্লিন শেভ করা, জিন্স আর সোয়েটার পরা, তারে দেখতে অনেকটা রিচার্ড অ্যাভেডনের ১৯৯৫ সালের বিখ্যাত পোর্ট্রেটের সেই আসামীর মত দেখায় যে নিজের অভিযোক্তাদের দিকে তাকায়ে ছিল। “আমার ফ্যামিলি ওই ছবিটা সহ্যই করতে পারে না,” হাসতে হাসতে বলতেসিলো উনি। আর পরে যখন জিজ্ঞেস করা হইলো ছবিটা কোথায় রাখা, সে শয়তানি হাসি দিয়া বললো, “দেয়ালেই ঝুলানো।”
যখন সে লিখতে বসে, রুশদী বলেন, “তখন আমার জন্য দিনের বেলা নিজের রুম হইতে বের হওয়া বেশ অস্বাভাবিক ঘটনা।” কিন্তু গতবছরের শেষেই উনি শালিমার দ্য ক্লাউন, উনার নয় নাম্বার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি জমা দিসেন, এবং এখনও নতুন কোনো কাজে হাত দেন নাই। যদিও উনার দাবি এই উপন্যাসটা লিখতে গিয়া তার সব রসদ ফুরায়ে গেসে, তবু দেখা গেলো নিজের অতীত, লেখালেখি আর রাজনীতি নিয়া আলাপ করতে করতে যেন উনি জোশ ফিরা পাইতে লাগলেন। আলাপ করার সময়ও রুশদী সেই একই মানসিক কসরত জারি রাখেন যা তার ফিকশনে পাওয়া যায়—মূল কথায় ফিরা আসার আগে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা গজাইতে থাকে যা বিভিন্ন মহাদেশ আর ঐতিহাসিক সময়কালরে টোক্কা দিয়া চইলা আসে।
সেই ফতোয়ার ফলে রুশদীর নাম এখন যেকোনো জীবিত ঔপন্যাসিকের চেয়ে বেশি চেনাজানা। কিন্তু এইসব রাজনৈতিক আক্রমণে লেখক হিসেবে রুশদীর রেপুটেশন একটুও কমে নাই। ১৯৯৩ সালে তার মিডনাইটস চিল্ড্রেন বইটারে ‘বুকার অফ বুকার্স’ এওয়ার্ড দেয়া হয়, ২৫ বছর আগে এই বই পাবলিশ হওয়ার পর থেকে ম্যান বুকার প্রাইজ পাওয়া সকল বইগুলার মধ্যে এইটা শ্রেষ্ঠ হিসেবে। এবং বর্তমানে উনি পেন-আমেরিকান সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। উপন্যাস ছাড়াও, উনি পাঁচ খণ্ড ননফিকশনের এবং একটা গল্পগ্রন্থের লেখক। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে উনি নিজের জন্য একটা প্যাডওয়ালা চেয়ার নিয়া বসছেন, হালকা কইরা তুষার পড়তেসে, কয়েক ঘর দূর হইতে একটা চুল্লি আকাশে কালো ধুঁয়ার কলাম আঁইকা দিসে। রুশদি এক গ্লাস পানি খাইলেন আর মূল আলাপ শুরুর আগে বউরে কী গিফট দেয়া যায় তা নিয়া একটু কথা বললেন।
জ্যাক লিভিংস, ২০০৫
…
ইন্টারভিউয়ার: আপনি যখন লেখেন, তখন কি আপনারে যারা পড়বে তাদের কথা চিন্তা কইরা লেখেন?
সালমান রুশদি: আমি ঠিক জানিনা। যখন বয়স আরেকটু কম ছিল, তখন বলতাম, না, আমি কেবল আমার লেখার সার্ভেন্ট।
ইন্টারভিউয়ার: এইটা তো বেশ আইডিয়ালিস্টিক।
রুশদি: অতিরিক্ত আইডিয়ালিস্টিক। ইদানীং আমার কাছে লেখার ক্ষেত্রে স্পষ্টতারেই বেটার গুণ মনে হয়, জটিলতার চাইতে। তার কারণ এখন সম্ভবত আমি কিছুটা বুঝি মানুষ একটা বই কেমনে পড়ে, এইটা আমি জাজ করতেসি আমার লেখা বইগুলা এখন পর্যন্ত মানুষ কেমনে পড়সে তার উপর বেস কইরা। বাজারের মর্জিমত লেখা বই অবশ্যই আমার পছন্দ না, তবে এখন একটা গল্প বলতে গেলে আমার লক্ষ্য থাকে যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে লেখা, এবং তার মাধ্যমে রিডারের সাথে এনগেজ করা। তবে এইটা আগেও মনে করতাম, মিডনাইটস চিল্ড্রেন লেখার সময়ও। একটা জিনিস অদ্ভূত লাগতো যে এনগেজিং স্টোরিটেলিং আর মহৎ সাহিত্য যেন আলাদা পথে চইলা গেসে। কিন্তু দুইটারে এমন আলাদা ভাবাটা আমার কাছে বেহুদা মনে হইসে। একটা গল্পের সিম্পল হইতে হবে তা না, ওয়ান-ডিমেনশনালও হইতে হবে না, কিন্তু গল্পটা যদি জটিল এবং বহুমাত্রিকও হয়, তবু তো আপনার গল্পটা বলার একটা স্পষ্ট ওয়ে খুঁজতে হবে, যাতে রিডার এনগেজ করতে পারে।
আর আস্তে আস্তে যেই একটা সাবজেক্ট আমার নিজস্ব জিনিস হইয়া দাঁড়াইসে তা হইলো, কিভাবে পৃথিবীর যেকোনো জায়গার গল্প আসলে সবজায়গারই গল্প। কিছু মাত্রায় তা আমি আগে থিকাই জানতাম কারণ মুম্বাই, যেইখানে আমার বাইড়া ওঠা, সেই শহরে পশ্চিম পুরাপুরি পুবের সাথে মিইশা ছিল। আমার জীবনের নানান দুর্ঘটনা এখন আমারে এই ক্ষমতা দিসে যে আমি দুনিয়ার নানান জায়গার ঘটনারে আমার গল্পের অংশ বানায়া নিতে পারি, কখনো কখনো তারা শান্তিতে মেলে, বা কখনো তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাইগা থাকে—বা বেশিরভাগ সময় দুইটাই একসাথে ঘটে। এইসব গল্প লেখার একটা সমস্যা হইলো আপনি যদি সবজায়গার গল্প লিখতে বসেন, তাইলে শেষমেষ দেখা যাইতে পারে আপনি কোনো জায়গার গল্পই লিখতে পারেন নাই। যেইসব লেখকরা স্রেফ একটা জায়গারে কেন্দ্র কইরা লেখে তারা এই সমস্যাটা ফেস করে না। সেইসব লেখকরা অন্য কোনো প্রবলেম ফেস করে। কিন্তু ফকনার বা ওয়েল্টির মত লেখকদের যা আছে–দুনিয়ার বুকে একটুখানি জায়গা যা তারা এতটাই ভালোমত চেনে, এবং তাদের শিকড় ওই জায়গাটার এতই ভিতরে যে তারা সারাটা জীবন সেই জায়গা নিয়া লিখ্যা গেলেও তা ফুরাবে না–এই জিনিসটা আমার অনেক ভাল্লাগে, কিন্তু আমি এইভাবে লিখি না। Continue reading