আমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দীন আহমদ (সিলেক্টেড পার্ট ১)
[আব্বাসউদ্দীন আহমদের (১৯০১ – ১৯৫৯) অটোবায়োগ্রাফি “আমার শিল্পী জীবনের কথা” বইটা ছাপা হয় উনি মারা যাওয়ার পরে, ১৯৬০ সালে। এই বইটার কিছু অংশ বাছবিচারে ছাপানোর প্ল্যান করছি আমরা।]
…
প্রথম গানের প্রেরণা
॥ মোহররমের মর্সিয়া ॥
আমার নাম ছিল শৈশবে স্ত্রী সেখ আব্বাসউদ্দীন আহমদ। গ্রামে তথা সমস্ত কুচবিহারে মুসলমান সমাজে এক আন্দোলন উঠল—নামের পূর্বে এই ‘সেখ’ কথাটা ভুলে দিতে হবে। আমার তখন বয়স হবে আট বছর। পরিষ্কার মনে পড়ে আমাদের মহুকুমা তুফানগঞ্জে আমি সেদিন বাবার সাথে গিয়াছিলাম এক বিরাট সভায় যোগদান করতে। এক পয়সার কার্টিজ কাগজের শত শত কাগজে সবাই নাম লেখা আরম্ভ করল ‘সেখ’টা বাদ দিয়ে শ্রী অমুক বলে— সেই দস্তখত-নামা কাগজগুলো দরখাস্ত-সহ সেখানকার কাছারীতে জমা দেওয়া হয়েছিল। এর কারণ তখন বুঝিনি। পরে বুঝেছিলাম যে তখন সাধারণতঃ শিয়া মুসলমানরা নাকি নামের আগে ঐ শব্দটি ব্যবহার করতেন। অতএব আমাদের সুন্নীদের এটি পরিত্যাগ করতে হবে। গ্রামে আরও প্রচার হতে লাগল যে এবার যারা মোহররমের সময় বাড়ীতে তাজিয়া তৈরী করবে তাদের সংগে সামাজিকতা চলবে না। আমাদের গ্রামের সমাজে তখন সত্যিই বড় কড়াকড়ি নিয়ম ছিল। ছোটখাট মামলা-মোকদ্দমা আমার বাবা মৌলবী জাফর আলী আহমদ, বড় মামা ও কুচবিহার মহারাজার নাজিরের বংশধর কুমার গৌরনারায়ণ সিং এঁরাই মীমাংসা করে দিতেন। আমি অতশত বুঝতাম না, তবে মনটা বেশ খারাপ হল এই ভেবে যে গ্রামে আর তাজিয়া দেখতে পাব না। কী অপূর্বভাবে কাঁচি দিয়ে কাগজ কেটে সূক্ষ কারুকার্যের পরিচয় দিত আমের তাজিয়া তৈরী করার —এমন সুন্দর জিনিষ উঠে যাবে গ্রাম থেকে … আর বন্ধ হয়ে যাবে মোহররমের বাজনা এবং সংগে সংগে মোহররমের জারী!!
মোহররমের বাজনা সত্যিই গ্রামে বন্ধ হল কিন্তু ভিন গাঁয়ে উঠল কাড়া-নাকাড়া শানাইয়ের বাদ্য। তারা যখন আমাদের গ্রামের গঞ্জে দলে দলে এসে বাজনা এবং লাঠিসোটার খেলা দেখাতে লাগল তখন আমাদের গ্রামের যুবকরা যারা সমাজের ভয়ে দল ভেঙেছিল তারাও লুকিয়ে গিয়ে ‘ডম্প’ (এক রকম ঢোল বাদ্যবিশেষ) নিয়ে দলের সাথে ভিড়ে গেল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রামের আশেপাশে প্রায় দশ বারোখানা গ্রামের মোহররমের দল ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল ।
বাড়ী থেকে প্রায় দুই তিন মাইল দূরে সত্য-পীরের গান শুনতে গেলাম একদিন। যেখানে সেই দলের মূল গায়েন গেয়ে উঠল,
ও ভাই আল্লা বলরে রসুলের ভাবনা
দিনে দিনে হইল ফারাজি সিন্নি খাওয়া মানা ।।
অবশ্য এ গান শুনেছিলাম মোহররম উপলক্ষ্যে। তাজিয়া দিয়েছিল কালজানি নদীর ওপারে বিরাটভাবে এক জোতদার । তখনকার দিনে শুনেছি পাঁচ টাকার নাকি গোলমরিচই কিনেছিল সেই মেজমানীতে লোক, খাওয়াবার জন্য। গান শুনে আমার মনে হয়েছিল যারা শিয়াদের রীতিনীতি পরিত্যাগ করে বাটি সুন্নীমত গ্রহণ করেছিল তাদের উদ্দেশ্য করেই এ গান রচনা। ফারাজি মানে নামাজী; সিন্নি মানে তাজিয়া উপলক্ষ্যে যে সিন্নি বা খাওয়ার আয়োজন করা হয়।
গ্রামের অধিকাংশই ছিলেন শিয়া মতালী। তাঁরা রূপান্তরিত হলেন সুন্নী মুসলমানে। কাজেই গান বলতে মর্সিয়া আর মোহররমের বাদ্য গ্রাম থেকে নিল চিরবিদায়।
কিন্তু আমার ভাগ্য ভাল আমার গ্রামে ছিল বহু ভাওয়াইয়া গায়ক, সারা গ্রামটা সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত গানের সুরে মুখরিত হয়ে থাকত। বাড়ীর পূর্বে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। আমাদের আধিয়ারী প্রজারা হাল বাইতে বাইতে পাট নিড়াতে নিড়াতে গাইত ভাওয়াইয়া গান। সেই সব গানের সুরেই আমার মনের নীড়ে বাসা বেঁধেছিল ভাওয়াইয়া গানের পাখী। Continue reading