একই সময়ে যখন সাহিত্য ও কলা আর পেরায় সবকিছুই যখন পুরুষের আধিপত্যে, খুব কম নারী মাত্র কবি হিসাবে সম্মান পাইতেন, ইরানের কবি ফোরো ফারোখজাদ ঐসময় সেক্স আর সমাজের বাঁধা উপেক্ষা করি, একজন নারী কোনটা প্রকাশ করতে পারবে না পারবে, সেন্সুয়ালিটির লগে জড়িত সীমানা অতিক্রম করি সামনে আসেন।
নিউ ইয়র্ক টাইমের সূত্রে আমির আলী রিডজির লেখা থেকে জানতে পাই,
একজন রেডিও ইন্টারভিউয়ার ফোরো ফারোখজাদের লেখাকে মেয়েলি বলে চিহ্নিত করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
একজন সাহসী কবি হিসাবে তিনি অন্ধকারযুগের রীতিকে তুচ্ছ করি বলেন, “হিউম্যানিটিই আসল, নর কিংবা নারী হওয়া না”
বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আত্মরক্ষা করে, নারীর ভিতরের সত্তার লগে যুদ্ধ করে (যা ট্যাবু হিসাবে বিবেচিত) তাদের ইনটিমেট সিক্রেট, ডিজেয়ার, দুঃখ, কষ্ট আর একই সাথে ভালো লাগা-মন্দ লাগা যা অধিকাংশ নারীর নিরবতার ভিতরেই থাকি যায়, তা নিয়েই তিনি লেখালেখিতে হাজির হন। ওনার শারীরিক ও মানসিক অন্তরঙ্গতার প্রকাশ, যা ইরানী নারীদের কবিতায় অনুপস্থিত ছিল, তাঁরে সমালোচনার কেন্দ্রে বসায়, এমনকি ঐসময়কার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও।
এসব কারণে তিনি নৈতিক অবক্ষয়সম্পন্ন নারী হিসাবেও চিহ্নিত ছিলেন।
ফোরা ফারোখজাদ শুধু একজন ইরানী কবিই নন, ফিল্ম ডিরেক্টরও ছিলেন। ফারোখজাদ নিঃসন্দেহে বিশ শতকের ইরানের সবচাইতে প্রভাবশালী কবিদের একজন। তিনি একজন বিতর্কিত আধুনিক কবি ও প্রথাবিরোধী ব্যক্তি। তাঁর জন্ম তেহরানে ১৯৩৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি একজন। তিনি নবম গ্রেড পর্যন্ত স্কুলে যান। এরপর পেইন্টিং ও সিলাইয়ের কাজ শিখেন মেয়েদের স্কুলে। ১৬ বছর বয়সে ওনার বিয়া হয় স্যাটেয়ারিস্ট পারভেজ শাপুরের লগে। বিয়ার পর ওনারা আহভাজে চলি গেলে এর একবছর পরে ওনার একমাত্র পোলার জন্ম হয়। দুই বছরের মধ্যে, ১৯৫৪ সালে, তাঁদের ডিভোর্স হয়ে যায়। আর বাচ্চার কাস্টডি চলে যায় পারভেজের কাছে। এরপর ফারোখজাদ তেহরানে ফিরি আসেন কবিতা লিখতে আর ১৯৫৫ সালে “Captive” নামে তাঁর লেখার পয়লা ভলিউম প্রকাশ করেন।
শুরু থেকেই ফারোখজাদের লেখা একজন ডিভোর্সি, বিতর্কিত, শক্ত নারীকণ্ঠেের হওয়াতে নানান সমালোচনা ও সরাসরি বিরোধিতার শিকার হয়। ১৯৫৮ সালে নয়মাস তিনি ইউরোপে কাটান আর এ সময় ওনার মিট হয় ফিল্ম মেকার ও লেখক ইব্রাহীম গোলেস্তানের লগে, যিনি তাঁকে পুনরায় শক্তি জোগান তাঁর নিজস্বতা প্রকাশ ও স্বাধীন চলাফেরায়। তাবরীজে গিয়ে ইরানিদের লেপরোসিতে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে ফিল্ম বানানোর আগে তিনি তাঁর লেখাগুলার দুইয়ের অধিক ভলিউম প্রকাশ করেন, “The Wall” ও “The Revelion” নামে। ওনার ১৯৬২ সালের “The House is Black” নামের এক ডকুমেন্টারি ফিল্ম বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড জয় করে। এসময় শ্যুটিংয়ের ১২ দিনের মধ্যে তিনি হোসাইন মনসুরির লগে এটাচড হন। তিনি ঐ পোলার পালক নেন, আর তারে পালতে তাঁর মার বাসায় নিয়ে যান। ১৯৬৩ সালে তিনি “Reborn” বইটা প্রকাশ করেন। আর তাঁর কবিতাও তখন স্বতঃস্ফূর্ত ও পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে আর আগের ইরানি আধুনিক কবিতার লগে একটা স্বতন্ত্র পার্থক্য তৈয়ার করে নিজস্ব আসনে বসে।
এই তুখোর কবি মাত্র ৩২ বছর বয়সেই ফেব্রুয়ারী ১৩, ১৯৬৭ সালে মারা যান রোড এক্সিডেন্টে। এত অল্প বয়সে মারা গেলেও তিনি আবালবৃদ্ধবনিতা অনেকেরই প্রিয় হয়ে যান। তাঁর কবিতা গান, পেইন্টিংস আর প্রবন্ধ লেখারেও অনুপ্রাণিত করে। অথচ ইসলামী বিপ্লবের পরে তাঁর কবিতা পেরায় এক দশকেরও বেশি সময় নিষিদ্ধ আছিল। Nasser Saffarian তিনটা ডকুমেন্টারী তৈয়ার করেন ওনার উপর The Mirror of the Soul(2000), The Green Cold (2003),Summit of the Wave (2004) নামে।
ওনার কবিতা ইংরেজিতে তরজমা করেন Soleh Wolpe, Sin: Selected poems of Forough FarrokhZad, ,The Sad Little Fairy Maryam Dilmaghani। এছাড়াও গুগলে ছড়ানো ছিঁটানো অনেক জায়গা থেকে ওনার কবিতাগুলা পাইছি। ওনার কবিতার প্রকাশভঙ্গি আর অভিজ্ঞতায় নতুন ধরনের স্বাদ থাকাতে এক পড়াতেই ভালো লাগি যায় আমার। তো, খুঁজতে যাই দেখলাম বাংলায় মলয় রায় চৌধুরী ওনার কিছু কিছু কবিতা তরজমা করছেন। বিষয়বস্তুর দিক থেকে যদিও মোটামুটি ওগুলা আলাদাই আর ভাষার দিক থেকেও। ভালো লাগার জায়গা যেহেতু ব্যক্তিভেদে ভিন্ন, আমিও কিছু কবিতা তরজমা করলাম পড়তে যাই, হয়ত কারো না কারো ভালো লাগি যাবে। ইরানের মত জায়গায় বিশ শতকের একজন নারীর লেখায় এরকম ধার আর স্বতঃস্ফূর্ততা, আশা করি একদম ভিন্ন রকম একটা জার্নিই হবে কবিতাপ্রেমী যেকারোর জন্যে।
রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা
…
পুনর্জন্ম
আমার পুরা অন্তর এক কুয়াশাচ্ছন্ন কবিতা—
যা তোমারে বারবার আওড়ায়ে এর মধ্য দিয়ে নিজেরে বয়ে নেয়
সেই চির উম্মোচিত আর কুসুমিত ফজরের দিকে।
এই কবিতায়, আমি তোমার নামে লম্বা দম ফেলি, আহ!
এই কবিতায়, আমি তোমারে কলম করি লাগাই গাছে, পানিতে আর আগুনে..
সম্ভবত জীবন এমন এক লম্বা পথ—
যা একজন মহিলা ঝুড়ি নিয়ে পার হয় প্রত্যেকদিন।
সম্ভবত জীবন এমন এক ছাদ—
যার লগে একটা পুঁথি থেকে নিজেরে ঝুলায়ে দিছে কোন পুরুষ।
সম্ভবত জীবন স্কুল থেকে বাড়িতে ফেরা এক শিশু।
সম্ভবত জীবন কোন সিগারেটের আগুন—
দুইজন পিরীতাহতের মধ্যকার জীবননাশক নিরবতা
অথবা সেই বিহবল পথ—
যা কোন পথিকেরে উষ্টা খাওয়ায়
আর কোন পথিকেরে ফাঁপা হাসিতে জানায়, সুপ্রভাত!
সম্ভবত জীবন সেই দমবন্ধ মূহূর্ত—
যখন আমার দিষ্টি নিজেই ধ্বংস হয়ে গেছিল তোমার চোখের পুতলিতে
আর তা এমন এক বোধ—
যা আমি মিলাইতে পারব চান্দের ধারণার লগে আর আন্ধারের শুভেচ্ছায়—
একটা রুমে কারোর নিঃসঙ্গতার পরিমাপে
আমার অন্তর
একজনের পিরীতের মাপে তাকায়ে আছে
নিজের সুখের মতন নরমাল ছুতার দিকে
ফুলের টবে ফুলের মনোরম কোমলতার দিকে
আমাদের পুষ্পশয্যায় রোয়া চারাগাছের দিকে
ক্যানারীদের গানের দিকে—যারা একটা জানলার আয়তন গায়
আহ!
এই আমার কপাল
এই আমার কপাল
আমার কপাল—
একটা আসমান, যা আমার থেকে লুট হওয়া একটা পর্দার পতন
আমার কপাল নামতেছে এক পরিত্যক্ত সিঁড়ি বাই
আর যোগ দিতেছে কিছু ক্ষয় আর স্মৃতিকাতরতার লগে
আমার কপাল স্মৃতির বাগানে এক নিরানন্দ হাঁটাহাঁটি
আর একটা ভয়েসের দুঃখে মরতে থাকা—
যা আমারে কয়:
“আমি তোমার হাত ভালোবাসি”
আমি আমার হাতরে রুয়ে দিব ফুলের বিছানায়
আমি গজাবো, আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি
আর চড়ুইগুলা ডিম পাড়বে
আমার কালিমাখা আঙুলের শাখায় শাখায়
আমি ঝুলাবো আমার কান ঘিরে
জমজ লাল চেরীর এক জোড়া কানের দুল
আমি ডালিয়ার পাপড়ি রাখব আমার নখে
সেখানে এক সরুগলি আছে, ঐসব বালকেরা যেখানে খেলে
যারা আমার লাভার আছিল একসময়
অমনই আলুথালু চুল, পাতলা ঘাড় আর রোগা পায়ে—
আর এখনো ভাবে সেই ছোট্ট মেয়েটার নিষ্পাপ হাসির কথা—
যে এক রাতে বাতাসে উড়ি গেছিল
সেখানে এক সরুগলি আছে
যা আমার অন্তর চুরি করছে
আমার শৈশবের জায়গা থেকে
এই পরিমাণের জার্নি সময়ের লগে
আর এই পরিমাণ বাঁজা সময়রে পুরা করছে
একটা সচেতন সিনারীর স্বর—
একটা আয়নায় লীন হওয়া থেকে ফিরা—
এইভাবেই
কেউ মারা যায়
আর কেউ বাঁচি থাকে।
কোন জালিয়াই কিন্তু মুক্তা ধরে না
একটা খাদায় বইতে থাকা সামান্য ধুঁয়া থেকে
আমি চিনি
দরিয়ায় আলতো করে নরম হয়ে বইতে থাকা
এক দুঃখি মেছোকন্যারে—
তার অন্তর এক কাঠের বাঁশির মধ্যে
এক দুঃখি মেছোকন্যা–যে রাতে একটা চুমুতেই মরি যায়….
Continue reading →