রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষা-সমস্যা: কাজী মোতাহার হোসেন (১৯৪৭)
[কাজী মোতাহার হোসেনের এই লেখাটা ছাপা হইছিল “তমুদ্দন মজলিসের” “রাষ্ট্রভাষা কি বাংলা হইবে? – নাকি উর্দু” বুকলেটে, ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পরে মাসিক সওগাত পত্রিকাতেও ছাপা হইছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে – সেইটা নিয়া কথা-বার্তা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের আগেই হইতেছিল। এই লেখাটা অই তর্ক-বিতর্কের একটা অংশ।]
কোনো দেশের লোকে যে ভাষায় কথা বলে, সেইটিই সে দেশের স্বাভাবিক ভাষা। প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে আবার বাংলাদেশের ভাষা সম্বন্ধে সমস্যা ওঠে কি করে? সত্য সত্য এইটেই মজার কথা—যা স্বাভাবিক, তা অনেক সময় জটিল বুদ্ধি দিয়ে সহজে বোঝা যায় না। একটু পরিষ্কার করে বলবার চেষ্টা করছি।
ধরে নেওয়া যাক, কোনো দেশের শতকরা ৯৯ জন বাংলা ভাষায়, আর বাকি শতকরা ১ জন মাত্র ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী প্রভৃতি ভাষায় কথা বলে। আরও মনে করা যাক, এই শেষোক্ত ব্যক্তিরা বাণিজ্যসূত্রে বা শাসক হিসাবে সে দেশে গিয়ে প্রতিষ্ঠাবান হয়েছে এবং অল্প শিক্ষিত বা অল্প বিত্তশালীদের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। তাই এরা সে দেশের লোকের প্রতি ও তার ভাষার প্রতি স্বভাবতই অশ্রদ্ধাবান। সে দেশের ভাষা শিক্ষা করে তাদের সঙ্গে কাই-কারবার করা এরা অনাবশ্যক শক্তিক্ষয় বলে মনে করে, আর তাতে এদের আত্মসম্মানেও আঘাত করে বৈকি! অবশ্য, বিজিত জাতি বা শোষিত অধমর্ণের আত্মসম্মান থাকে না, আর তা শোভাও পায় না। বিশেষত বিজেতা বা উত্তমর্ণের ভাষা শিক্ষা করে তাদের সঙ্গে দহরম মহরম রাখতে পারলে তাদের সন্তুষ্টি সাধন করা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে জীবিকা অর্জনের পথও প্রশস্ত হয়। আর একটা প্রধান কথা, এইভাবে দেশের আপামর সাধারণের সঙ্গে নিজেদের বিরাট পার্থক্য সংরক্ষণ ও স্মরণ করে যথেষ্ট মর্যাদা অনুভব করা যায়। বিজেতা উত্তমর্ণের অনুগৃহীত এই সৌভাগ্যবানেরাই দেশের নেতা এবং জনগণের নামে সমুদয় সুবিধা ভোগের অধিকারী। বর্তমানের সমাজ ব্যবস্থায় ইহা স্বাভাবিক, কারণ মূঢ়-মূকদের বঞ্চিত করায় ভয়ের কারণ নেই বরং না করা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় মাত্র।
এই হলো মোটামুটি বাংলাদেশের এবং বিশেষ করে বর্তমান পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষাসমস্যার মানসিক পটভূমি।
পাঠান রাজত্বে রাজভাষা ছিল পোস্তু, আর মোগল আমলে ফার্সী। মোগল-পাঠানেরা বিদেশী হলেও এদেশকেই জন্মভূমি-রূপে গ্রহণ করেছিলেন এবং দেশের অবস্থা জানবার জন্য দেশীয় ভাষাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে পাঠানরাজদের পৃষ্ঠপোষকতায় রামায়ণ ও মহাভারত বাংলাভাষায় অনূদিত হয়, তা-ছাড়া ভাগবত এবং পুরাণাদিও রচিত হয়। এর আগে বাংলা ভাষা নিতান্ত অপুষ্ট ছিল, এবং ভাষা জনসাধারণের ভাষা বলে পণ্ডিতদের কাছে অশ্রদ্ধেয় ছিল। তখনকার পণ্ডিতেরা কৃত্রিম সংস্কৃত ভাষার আবরণে নিজেদের শুচিতা ও শ্রেষ্ঠতা রক্ষা করতেন। রাজসুলভ উদারতার সঙ্গে গৌড়ের পাঠান সুবাদারগণ পণ্ডিতদের বিরুদ্ধাচরণ অগ্রাহ্য করত সাধারণ লোকের সুবিধার জন্য (এবং হয়তো সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরও গল্প-পিপাসা নিবৃত্ত করবার জন্য) এই সকল পুরাণ ও রামায়ণ-মহাভারত রচনা করান। বলা বাহুল্য দেশীয় কালচারের ধারা রক্ষা করবার পক্ষে এবং দেশবাসীর নৈতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এই সব পুস্তকের তুলনা নাই। কতকটা এই কারণেই আজ ভারতবর্ষের সামান্যতম কৃষকরাও এক একজন দার্শনিক বলে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের বিস্ময় উৎপাদন করেছে। বাস্তবিক দেশবাসীর ভাষা বৈদেশিক শাসকের উৎসাহ পেয়েছিল বলেই বাঙালীরা আত্মস্থ ছিল এবং ইসলামী সভ্যতার থেকে অনেক উৎকৃষ্ট বিষয় গ্রহণ করে নিজেদের জীবন ও সভ্যতাকে পুষ্টতর করতে পেরেছিল। অন্যদিকে, মুসলমান শাসকগণ এবং জনসাধারণও হিন্দু ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে কাল অনুযায়ী ইসলামের নব নব বিকাশ সাধন করে কার্যক্ষেত্রে স্বাভাবিক ধর্ম ইসলামের উদারতা ও সর্বোপযোগিতাই প্রমাণিত করেছে। Continue reading