অসুখের দিন (কিস্তি ৭)
[ব্যর্থ এক সার্জারি নিয়ে ভোগান্তির কাহিনি এটা। যার মূল পর্ব শুরু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, এখনো চলমান। এখন একটা সিনেমাটিক ক্লাইমেক্সে দাঁড়ায়া আছে। তবে সেই গল্পে দুর্ধর্ষ কোনো অ্যাখ্যান নাই, বিরাট কোনো বাঁক-বদল নাই। অনেক বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস আছে। কিন্তু এ গল্প আমার খুবই কাছের, আমার বর্তমান। আমার স্বজনদের জন্য পরীক্ষার, আমাকে ভালোবাসার। সেই গল্পটা আমার বন্ধুদের জানাতে চাই, অন্তত এক অধ্যায়ের সমাপ্তির আগে আগে। … অবশ্য পুরো গল্পটা এভাবে শেয়ার করা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। এখন পর্যন্ত সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বদলে দেওয়া।]
কিস্তি ১ ।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।। কিস্তি ৫ ।। কিস্তি ৬ ।।
…
পর্ব ১৩: ‘সুস্থ হয়ে গেছি’ বিশ্বাস হতে চাইল না
সব মিলিয়ে দেড়-দুই মিনিট কথা। ডা. মোহাম্মদ আলী কম্পিউটার স্ক্রিনের ওপারে। আমি আশ্বস্ত হতে পারছিলাম না। কিন্তু উনি খুবই নিশ্চিত, আমার কোনো সমস্যা নাই। আমি আসলে কী চাইছিলাম, জানি না। মানে, খুবই তো খুশি হওয়ার কথা। তারপরও উনার চেম্বার থেকে যখন হলাম, মনে হলো, হ্যাঁ এটা তো দারুণ একটা ব্যাপার। নিজেকে স্বাধীন মানুষ মনে হতে লাগল। এ মুহূর্তে যা যা করতে চাই, তার জন্য প্রস্তুত।
নিচে নেমে রিকশা নিলাম। অফিসে যাবো। এত দ্রুত ডাক্তারকে পেয়ে গেছি যে, অফিসের গাড়ি ধরার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। যেতে যেতে ফোনে রাশেদ আর মিশুকে জানালাম খুশির খবরটা। ওরা বেশ খুশি। তারপর বাড়িতে ফোন করলাম। ডা. মহসিন শুনেও খুশি। যদিও উনি আগে থেকে এমন কথায় বলছেন।
‘আমি পুরোপুরি সুস্থ’ মিশ্র একটা অনুভূতি। ঠিকঠাক, ভালো আছি বা সমস্যা নাই; বিষয়টা বিশ্বাস হতে চায় না। এত এত জটিলতার ভেতর দিয়ে আসার পর মনে হয় না যে, এত সহজে ব্যাপারটার নিস্পত্তি হবে। কিন্তু একটা বিষয় সময়ে তো একটা ঘটনা ঘটে। যার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি বা না থাকি। সেখানে আগের অভিজ্ঞতা কখনো মেনে নিতে বাধা দেয়। পেছনে তাকালে অনেক লম্বা পথ মনে হলেও, হুট করে মনে হয়, জীবনটা অল্প দিনের। যেন এই অসুখও দুদিনের আগে। ফলে সমাধানটা বিশ্বাস হয় না। অবিশ্বাস্য হলেও, এমন কথা শুনে কেমন যেন খারাপও লাগছিল।
একটা অভ্যাস, বা রোগ, যেন আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে। তাকে বিসর্জন দিতে খারাপ লাগছিল। আরেকটা যুক্তি হলো, এই অসুখ আমাকে জীবনের চ্যালেঞ্জ থেকে মুক্তি দিয়েছে। অজুহাত হিসেবে কাজ করেছে আমার অলস, সাহসহীন জীবনে। এখন তো একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো সবকিছুর মুখোমুখি হতে হবে। মাত্র দেড় বছরেই সবকিছু এভাবে বদলে গেল। জীবন তো নিছক যাপনের অভ্যাস নয়, উত্থান-পতন, নানা বাঁক আছে। শুধু এটা নয় যে, আমরা সুস্থ বা স্বাভাবিক থাকলেই নিজের ইচ্ছাগুলোকে কাজে লাগাতে পারি। আসলে তা নয়, আমরা অস্বাভাবিক একটা শর্ত, যেটা আমি না চাইলেও বর্তমান।
হ্যাঁ। আমি বলেছিলাম, আমরা একটা খুশির খবর পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেটা এপ্রিল-মে মাস থেকে। যদিও সার্জারি সম্পর্কিত একটা অনিশ্চয়তা ছিল। আমরা এই কয় মাসে নানান টেস্ট করালাম। মোটামুটি সব স্বাভাবিক। আমার স্ত্রীকে একটা ইঞ্জেকশন নিতে হলো। ওষুধপত্র বাবদ বেশ খরচ হয়ে যাচ্ছিল। মনে আছে, ঈদুল আজহায় আমরা হোম অফিসে ছিলাম। ঈদের দিন পড়েছিল ইঞ্জেকশনের ডেট। দুই ঘণ্টা আরেকজনের হাতে দায়িত্ব দিয়ে হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসি। আমাদের ভাগ্য হলো, নেক্সট পরীক্ষায় ইঞ্জেকশনের ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। ডাক্তার আমাদের আশ্বস্ত করলেন। এ দিকে বউয়ের ট্রেনিং শেষ হয়ে আসলো। উনি ১৪ আগস্ট চলে গেলেন। পরদিন ১৫ আগস্টের প্রোগ্রাম থাকার কথা স্কুলে।
আমরা একদিন-দুইদিন করে অপেক্ষা করছিলাম সুখবরের জন্য। বিশেষ করে ওনার তর সইছিল না। যাক, কয়েকদিনের মধ্যে জানা গেল, রিপোর্ট পজিটিভ। আমাদের সবার মাঝে খুশির রেশ ছড়ায়া গেল। মনে হলো, এত এত কষ্ট, টেনশনের পর এটা একটা উপহার। সুদিনের আভাস। আমি যখন অসুখের গল্পটা বলার পরিকল্পনা করছিলাম, তখন এ ধরনের একটা সমাপ্তি খুঁজছিলাম। কিন্তু কে জানে এমন একটা সমাপ্তিতে পৌঁছাতে গেলে কতটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু তা-ই নয়, আমার অসুখের দিন এখানে শেষ নয়। Continue reading