আমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দীন আহমদ (সিলেক্টেড পার্ট ৪)
পার্ট ১ ।। পার্ট ২ ।। পার্ট ৩ ।।
…
।। চাকুরী ও বিয়ে ॥
দু’বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা অর্জন করলাম। বাংলা সরকারের কৃষি দফতরে একটা পাকা চাকুরী খালি হল, দরখাস্ত করলাম। চাকুরীটা হয়ে গেল। ডি. পি. আই অফিসের অস্থায়ী চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে পাকা চাকুরীতে ঢুকলাম। আমার উর্ধ্বতন, কৃষি বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর ওয়েস্টার্ন সার্কেল, তিনি একদিন বললেন, “আচ্ছা, আপনার নাম কি সেই, আজকাল যার রেকর্ডে খুব নাম শুনি… সেইই?” আমি অতি বিনয়ে বললাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ।” তার নাম যদুনাথ সরকার। তিনি হেড এসিস্টেন্টকে ডেকে বললেন, “দেখুন, একে কোনও জটিল কাজ দেবেন না। অফিসে এসে নাম দস্তখত করে যেখানে খুশী সেখানে যাবেন, বিশেষ করে দুপুরে যদি রেকর্ড করবার জন্য রিহার্সেলে যেতে চান কক্ষণো বাধা দেবেন না। আমার বিভাগে এমন লোক পেয়েছি এতেআমাদের সৌভাগ্য।” বলা বাহুল্য বৃদ্ধ হেড এ্যাসিস্টান্ট ধর্মদাস-বাবু এ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম করেন নি। আমি তাই এই দুজনের কাছেই কৃতজ্ঞ। এঁদের কাছে বাঁধাধরা নিয়মে চাকুরী করতে গেলে সত্যিই আমি আমার সংগীতসাধনার পথে নির্বিবাদে এগুতে পারতাম না।
গ্রামোফোন কেম্পানীতে একদিন কাজিদার ঘরে হরিদাস, মুণাল আর কে কে বসে গল্প হচ্ছিল। এমন সময় আমি গেলাম। জানি না কি. ব্যাপার, হঠাৎ কাজিদা বলে উঠলেন তাদের উদ্দেশ করে, “দেখ তোমাদের কাছে একট। কথ বলি। আব্বাস আমার ছোট ভাই। দিন দিন গানে চমৎকার নাম করছে। যদি তোমরা কেউ একে কোনদিন খারাপ পথে নিয়ে যাও তাহলে তোমাদের জ্যান্ত রাখব না।” বলাই বাহুল্য কাজিদার একথা সবাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল।
একদিনকার একট ঘটনা বলি। কবি শৈলেন রায় আমার বাল্যবন্ধু। অভিনেতা দুর্গাদাসবাবু ভারী রসিক লোক, শৈলেন ও আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। প্রায়ই আমাদের দুজনকে বলতেন, “একদিন হোক না একপাত্র! দোষ কি?” আমি একদিন বললাম, “আপনার হাতে হাতখড়ি হওয়া মানে তে৷ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে খবর বলা। তিনি হেসে বলতেন, “আরে না না, কাকপক্ষীও জানতে পারবে না।” শৈলেন বলত, “তা দুর্গাদা’ আমাদের সজীব লিভারের ওপর আপনার এত হিংসা কেন?” নাঃ ডাল আর গলে না। দুর্গাদাসবাবুকে অনেকের কাছে বলতে শুনেছি, “বাবা, এরা কাদায় বাস করে কিন্তু কাদা গায়ে মাখে না।”
গ্রামাফোন কোম্পানীর রিহার্সেল রুমটা ছিল তখন অতি জঘন্য জায়গায় । ১৬০নং আপার চিৎপুর রোড, বিষ্ণুভবন। তার আশে-পাশের বহুদূরে ভদ্রলোকের বাস ছিল না। এ দুষিত আবহাওয়ায় নিজেকে বীচিষে রাখা কতদিন সম্ভবপর হবে এই নিয়ে দস্তুরমত চিন্তিত হয়ে পড়লাম। অকস্মাৎ একদিন মনস্থির করে ফেললাম। বাবাকে ‘জানিয়ে দিলাম, আমি বিয়ে করতে রাজী।
হল্দিবাড়ীতে আমার দোস্ত মশারফ হোসেনের কাছে বাবা চিঠি দিলেন। আমার জীবনের অন্তরংগতম বাল্যবন্ধু আমার দোস্ত মশারফ হোসেন। কুচবিহার জেন্কিন্স স্কুলে যখন সিস্কথ ক্লাশে ভর্তি হই, তখনই তার সাথে আমার প্রথম বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। একই হোস্টেলে থাকি। তারা তিনভাই বিরাট সম্পত্তির মালিক – আশৈশব পিতৃহীন। সম্পত্তি তাদের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে। এর বড় ভাইয়ের সাথে ছিল আমার বড় ভাইয়ের বন্ধুত্ব–তাই আমাদের দু’জনের মাঝেও গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। হোষ্টেলের সবাই বললে, বাঃ এরা দুটিতে বেশ মিল। দোস্তালি পাতাও। তাই দু’জন দু’জনকে দোস্ত বলে ডাকতাম। আমার দোস্ত এখন রংপুর ধাপে বাস করছেন।
দোস্ত আমাকে চিঠি দিল, তার ওখানে গেলাম, রংপুর জেলার ডোমার গিয়ে মেয়ে দেখলাম। দশ বার দিনের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল।
তখন সমাজের অবস্থা কি ছিল বলতে গিয়ে বিয়ের দিনের একটা ঘটনা বলতেই হচ্ছে। যেদিন মেয়ে দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন হবু শ্বশুরবাড়ীতে কী গানের ঘটা। হারমোনিয়াম বাজিয়ে কত গানই গেয়েছিলাম। পাড়ার লোক সেদিন আসর জমিয়েছিল।
বিয়ের দিন কলকাতা থেকে বন্ধুবান্ধব এসেছে। বিয়ের পর রাতে তকরীম আহমদ যেই সেতারে একটু টুংটাং শব্দ তুলেছে অমনি উঠেছে প্রতিবাদ। না, একি মুসলমানের বিয়ে-বাড়ী. গান-বাজনা সামাজিক প্রচলন নেই ইত্যাদি! বন্ধুদের এই অবমাননায় আমি গণ্ডগোলের ফাঁকে আঁধার রাতে শ্বশুরবাড়ী থেকে চলে গিয়ে রাত কাটিয়েছি দূরে এক হাই স্কুলের টেবিলে। রাতে ভীষণ ঝড় উঠেছিল। সমাজের এই রূঢ় আচরণে আমার বুকে ও উঠেছিল সেদিন সাত-সাগরের ঢেউ!
সারা রাত বর কোথায় বর কোথায় করে খুঁজেছিল সবাই। আমাকে পায়নি। বিয়ে-বাড়ীতে এ নিয়ে উঠেছিল মহা আলোড়ন। ভাগ্যিস বিয়ে পড়ানো আগেই হয়ে গিয়েছিল – কাজেই সবাই মনে করেছিল, পাখীকে শিকল পরানো হয়েছে, আরতো উড়তে পারবে না, খাঁচায় আসতেই হবে ফিরে।
সারারাত বাইরের ঝড় আর মনের ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে ভোরের দিকে টেবিলের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছি। প্রাতঃভ্রমণরত দু’একজন শ্বশুরবাড়ীর লোক আমাকে এ অবস্থায় আবিষ্কার করে শেষ পর্যন্ত নিয়ে আসেন মানভঞ্জনের পালার দৃশ্যে অবতীর্ণ হবার জন্য ।
পরবর্তীকালে অবশ্যি শ্বশুরবাড়ীতে যতবারই গিয়েছি গানের জন্য বাধা তে দূরের কথা ষে ক’দিন থাকতাম গলার অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকত যে দস্তরমত পনের-বিশ দিন গলাকে বিশ্রাম দিতে হত। Continue reading